শ্রীকৃষ্ণের লীলা থেকে জীবনের শিক্ষা: কেন তিনি পূর্ণ অবতার

 

শ্রীকৃষ্ণের লীলা থেকে জীবনের শিক্ষা

সনাতন ধর্মে শ্রীকৃষ্ণ এমন এক সত্তা, যাঁর মধ্যে প্রেম, রাজনীতি, বন্ধুত্ব, ত্যাগ এবং বৈরাগ্য—সবকিছুর এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। আসুন জেনে নিই তাঁর জীবনের প্রধান শিক্ষাগুলো এবং কেন তিনি সর্বগুণ সম্পন্ন।

 

শ্রীকৃষ্ণ কেন 'পূর্ণ অবতার'?

বেদে ও পুরাণে অবতারের ১৬টি কলার কথা উল্লেখ আছে। শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র অবতার যাঁর মধ্যে এই ১৬টি কলার (গুন) পূর্ণ বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল। তিনি একইসাথে একজন মাখন চোর শিশু, রাখাল বালক, বংশীবাদক, বীর যোদ্ধা এবং পরম কূটনীতিবিদ।  

 

জীবনের প্রতিটি রস (শৃঙ্গার, হাস্য, করুণ, রৌদ্র, বীর, ভয়ংকর, বীভৎস, অদ্ভুত ও শান্ত) তাঁর চরিত্রে সমভাবে বিদ্যমান ছিল। একারণেই তাঁকে 'ষোড়শকলাপূর্ণ পুরুষোত্তম' বা 'পূর্ণ অবতার' বলা হয়। 

কর্মযোগ: ফলের চিন্তা ছাড়া কাজ করা 

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় অর্জুনকে দেওয়া শ্রীকৃষ্ণের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— "কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন"। 

অর্থাৎ, তোমার অধিকার কেবল কর্মে, ফলে নয়। আমাদের বিষণ্নতার প্রধান কারণ হলো ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা। কৃষ্ণ আমাদের শিখিয়েছেন বর্তমান মুহূর্তে নিজের সেরাটা দিয়ে কাজ করতে, ফলাফল ভগবানের হাতে ছেড়ে দিয়ে। 

অধর্মের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো 

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ অস্ত্র ধরেননি, কিন্তু তিনি পাণ্ডবদের ন্যায়ের পথে পরিচালিত করেছেন। 

তিনি শিখিয়েছেন যে, শান্তি বজায় রাখা ভালো, কিন্তু যখন অধর্ম সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই পরম ধর্ম। কাপুরুষতা আর অহিংসা এক নয়—কৃষ্ণ আমাদের সাহসী হতে শেখান। 

নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব: কৃষ্ণ ও সুদামা 

কৃষ্ণ ও সুদামার কাহিনী আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, বন্ধুত্বে কোনো উঁচু-নিচু বা ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ নেই। শ্রীকৃষ্ণ দ্বারকার রাজা হয়েও তাঁর দরিদ্র বন্ধু সুদামাকে জড়িয়ে ধরে সম্মান জানিয়েছিলেন। এটি আধুনিক যুগে আমাদের সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত। 

সব পরিস্থিতিতে হাসিমুখে থাকা 

আপনি যদি শ্রীকৃষ্ণের পুরো জীবনী দেখেন—কারাগারে জন্ম, শৈশবে রাক্ষসদের আক্রমণ, প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছেদ, এবং শেষ পর্যন্ত কুরুক্ষেত্রের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ—সবকিছুর মাঝেও তাঁর মুখে সর্বদা একটি প্রশান্ত হাসি ছিল। 

তিনি শিখিয়েছেন যে, জীবন যুদ্ধের নামান্তর, আর এই যুদ্ধে জয়ী হতে হলে মনকে শান্ত ও উৎফুল্ল রাখতে হবে। 

 

শিক্ষাতাৎপর্য
ভালোবাসারাধা-কৃষ্ণের প্রেম শিখিয়েছে যে প্রেম কেবল শরীর নয়, আত্মার মিলন।
বিচক্ষণতাযে কোনো সমস্যাকে আবেগের বদলে যুক্তি দিয়ে বিচার করা।
ত্যাগবৃহত্তর মঙ্গলের জন্য ব্যক্তিগত সুখ বিসর্জন দেওয়া।
কর্তব্যআত্মীয়তার উর্ধ্বে উঠে ন্যায়ের পথে থাকা।

উপসংহার

শ্রীকৃষ্ণের লীলা কেবল ত্রেতা বা দ্বাপর যুগের কাহিনী নয়; এটি আজকের সময়ের জন্য সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক গাইড। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে রাজা হয়েও সাধারণের সেবা করা যায়, আর কীভাবে সাধারণ হয়েও অসাধারণ কর্ম করা যায়। তাঁর জীবনদর্শন অনুসরণ করলে আমরা কেবল আধ্যাত্মিক নয়, জাগতিক জীবনেও সফল হতে পারব।

 আরও পড়ুনঃ

 *  যাজ্ঞিক ব্রাহ্মণ পত্নীদের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের অনুগ্রহ

* সকলেই কেন ভগবানকে মানে না? 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url