শাস্ত্র অনুযায়ী ব্রত বা উপবাসের উপকারিতা ও ধর্মীয় গুরুত্ব

 

ব্রত বা উপবাসের উপকারিতা

সনাতন ধর্মে 'ব্রত' বা 'উপবাস' কেবল খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি আত্মা, মন ও শরীরকে শুদ্ধ করার একটি গভীর আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া। প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন তিথি, যেমন—একাদশী, শিবরাত্রি, প্রদোষ বা নবরাত্রিতে উপবাস পালনের বিধান শাস্ত্র নির্দেশিত। তবে এই ব্রত পালনের নেপথ্যে শুধু অলৌকিক বিশ্বাস নয়, রয়েছে গভীর শারীরিক ও মানসিক কল্যাণ। 

 

আসুন জেনে নেওয়া যাক শাস্ত্র অনুযায়ী ব্রত বা উপবাসের ধর্মীয় গুরুত্ব এবং এর শারীরিক ও মানসিক উপকারিতাগুলো কী কী।

 

ব্রত বা উপবাসের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব 

শাস্ত্র মতে, ‘উপ’ মানে নিকটে এবং ‘বাস’ মানে অবস্থান করা। অর্থাৎ, ঈশ্বরের নিকটে অবস্থান করাই হলো উপবাস।

 শরীরের পঞ্চভূত ও পাচনতন্ত্রের বিশ্রাম: শাস্ত্র অনুযায়ী, আমাদের দেহ গঠিত পঞ্চভূতে। মাঝে মাঝে উপবাস করলে জঠরাগ্নি (হজম শক্তি) বিশ্রাম পায়। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা হয়েছে—“লঙ্ঘনং পরমৌষধম্”, অর্থাৎ উপবাসই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ওষুধ।

দেহের বিষাক্ত পদার্থ (Toxins) নিষ্কাশন: নিয়মিত ব্রত পালনের ফলে শরীরের ভেতরে জমে থাকা দূষিত পদার্থ বা টক্সিন বাইরে বেরিয়ে যায়, যাকে আধুনিক বিজ্ঞানে 'ডিটক্সিফিকেশন' বলা হয়।

মানসিক শান্তি ও একাগ্রতা: উপবাসের ফলে শরীরে সাাত্বিক ভাবের উদয় হয়। রজঃ ও তমঃ গুণ হ্রাস পেয়ে সত্ত্ব গুণ বৃদ্ধি পায়, যা রাগ ও মানসিক অস্থিরতা কমিয়ে মনকে শান্ত ও একাগ্র করে।

সংকল্প শক্তি বৃদ্ধি: ব্রত পালনের মাধ্যমে মানুষের ইচ্ছাশক্তি (Willpower) এবং ধৈর্য অনেক বেড়ে যায়, যা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতা আনতে সাহায্য করে।

 

উপবাস পালনের সঠিক নিয়ম ও শাস্ত্রীয় বিধান 

 উপবাসের পূর্ণ ফল পেতে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি:
 

১. মন ও বাক্য শুদ্ধ রাখা: উপবাসের দিনে কেবল না খেয়ে থাকাই যথেষ্ট নয়; কারও সঙ্গে কটু কথা বলা, মিথ্যা বলা বা হিংসা করা থেকে বিরত থাকতে হয়।

২. সাত্ত্বিক চিন্তাভাবনা: সারাদিন ঈশ্বরচিন্তা, গীতা বা রামায়ণ পাঠ এবং জপ-ধ্যানে সময় কাটানো উচিত।

৩. সঠিক আহার: যারা নির্জলা (জল ছাড়া) উপবাস করতে পারেন না, তারা ফলমূল, দুধ বা জল গ্রহণ করে অনুকল্প উপবাস করতে পারেন।

৪. পারণের গুরুত্ব: নির্দিষ্ট তিথি শেষে সঠিক সময়ে শাস্ত্রীয় নিয়মে ব্রত ভঙ্গ বা ‘পারণ’ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, নয়তো ব্রতের পূর্ণ ফল মেলে না।

 
সনাতন শাস্ত্রের প্রতিটি ব্রত বা উপবাস আসলে দেহ, মন ও আত্মার এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এটি যেমন আমাদের দৈহিক সুস্থতা এনে দেয়, তেমনই মনকে করে তোলে শান্ত ও ঈশ্বরমুখী। তাই অন্ধবিশ্বাস হিসেবে নয়, বরং এর আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য বুঝে ভক্তিভরে ব্রত পালন করলে আমাদের জীবন পরম আনন্দে ও শান্তিতে ভরে উঠবে। 
 
আরও পড়ুনঃ  
 

* হরিনামই কলি যুগের একমাত্র উদ্ধার পথ  

* হরিনাম জপের বিজ্ঞানভিত্তিক সুফল 

Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url